Home আন্তর্জাতিক ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে উত্তাল দিল্লি, মোদি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের...

ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে উত্তাল দিল্লি, মোদি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ

0
2

১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়ার বিতর্ক, আটক হাজারো বিক্ষোভকারী; প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা

প্রকাশের তারিখ: ১২ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৪৫ মিনিট

ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে বিরোধী দলগুলো এবং তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়া, বিক্ষোভকারীদের আটক এবং দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরকে ঘিরে প্রতিবাদস্থলসংক্রান্ত বিতর্ক নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে বিরোধী দলগুলোর সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রা এবং সিজেপির নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচির উদ্যোগের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এদিকে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় চেয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিজেপি।

ভোটার তালিকা থেকে বাদ ১৩ কোটির বেশি নাম

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর)। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ব্যক্তি, প্রায় ১ কোটি দ্বৈত নিবন্ধন এবং প্রায় ৩ কোটি ব্যক্তির নাম রয়েছে, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিকবার নিবন্ধিত ব্যক্তিদের তথ্য সংশোধন করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, কমিশন জানিয়েছে, সংশোধনপ্রক্রিয়ায় বাদ পড়া যোগ্য ভোটারদের পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ দিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তবে বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। মুসলিমসহ সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের দাবি, এ ধরনের পরিবর্তন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

যন্তর মন্তর ঘিরে নতুন বিতর্ক

দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন, অবস্থান কর্মসূচি ও গণবিক্ষোভের পরিচিত কেন্দ্র। সেখানে প্রতিবাদ কর্মসূচির অনুমতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

সিজেপি এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সমাবেশের অধিকার সংকুচিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। দলটির প্রশ্ন, প্রতিবাদস্থল নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জনগণ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করা হয়েছে কি না।

দলটির বক্তব্য, যন্তর মন্তর ভারতের জনগণের প্রতিবাদের পরিচিত জায়গা। তাদের স্লোগান—‘এখন পুরো দেশই যন্তর মন্তর হয়ে উঠছে’—আন্দোলন অব্যাহত রাখার বার্তা দিচ্ছে।

আটক হাজারো বিক্ষোভকারী, মুক্তি সিজেপি নেতাদের

১০ অক্টোবরের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। রয়টার্স-এর ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হাজারো বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছিল। পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড স্থাপন করে এবং বিক্ষোভকারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে।

আটক ব্যক্তিদের মধ্যে সিজেপির কয়েকজন নেতাও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। তবে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

সোমবার নিরাপত্তার কারণে দিল্লির ছয়টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং ২০টির বেশি সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও পথ পরিবর্তনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি

সিজেপির নেতারা ভোটার তালিকা সংশোধন স্থগিত করা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের জন্য নির্দিষ্ট তারিখ ও সময় চেয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের পর দলটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত না পেলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

তাদের বক্তব্য, এই বিতর্ক শুধু নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বের প্রশ্ন নয়; বরং ভোটাধিকার, নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত।

সুপ্রিম কোর্টের পথে বিরোধীরা

সোমবার কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে উদ্বেগ জানাতে সুপ্রিম কোর্টের দিকে পদযাত্রা করে। তাদের পরিকল্পনা ছিল প্রধান বিচারপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়া।

তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বিরোধী নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বসতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয় আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ নিয়ে আলাদা আলোচনা বিচারিক নীতি ও শিষ্টাচারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করার পরামর্শ দেন।

এর আগে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে দায়ের করা আবেদনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে বলে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের বিষয়টিও সামনে এসেছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও সংশোধনপ্রক্রিয়ার কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন বলেছে, যোগ্য ভোটারদের তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং প্রক্রিয়াটি নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। বিজেপিও রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সামনে কী হতে পারে?

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ এখন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের সমালোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবাদ কর্মসূচি, ব্যাপক আটক, পুলিশের ভূমিকা এবং আদালত অভিমুখে বিরোধীদের পদযাত্রা—সব মিলিয়ে দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

এখন নজর থাকবে, সিজেপিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয় কি না, বিরোধীরা সুপ্রিম কোর্টে আনুষ্ঠানিক আবেদন করে কি না এবং নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত সংশোধনপ্রক্রিয়া নিয়ে কী পদক্ষেপ নেয়।

তবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৩ কোটির বেশি নামের সবগুলোই বেআইনিভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সংখ্যার মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত নিবন্ধিত এবং খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন ব্যক্তিদের নামও রয়েছে। একইভাবে, রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগও বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অস্বীকার করেছে।

সূত্র ও তথ্যসূত্র:

১. Reuters — Delhi shuts metro stations, restricts traffic as opposition marches against election chief

২. The Indian Express — After 13 crore names dropped from draft rolls, EC orders ‘left out’ voter drive

৩. The Guardian — India’s supreme court demands answers over changes to voter roll

৪. The Indian Express — Election Commission: Two commissioners objected to poll panel steps

বিডি ভিউজ বাংলা—দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ, তথ্য ও বিশ্লেষণ।

#IndiaPolitics #VoterList #NarendraModi #ElectionCommission #Democracy

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here