জাতীয় নিউজডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা
প্রকাশের তারিখ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেটের তারিখ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যবইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার তাঁর একটি ঐতিহাসিক ডায়েরির ছবিও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
এনসিটিবি জানিয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসিসি) নিবন্ধটি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকেই নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে নতুন অধ্যায় হিসেবে এটি যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)কে বলেন, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এনসিসিসি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান রয়েছে, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি থাকবে পাঠ্যবইয়ে
এনসিটিবির কারিকুলাম-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিবন্ধটিতে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রামে সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা, পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সম্মুখসমরের বিভিন্ন ঘটনা উঠে এসেছে।
নিবন্ধে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক তৎপরতা সম্পর্কে জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা রয়েছে। ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির কথাও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান শুরুর পর চট্টগ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘটনাপ্রবাহও নিবন্ধটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
‘উই রিভোল্ট’ থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ
নিবন্ধে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মুহূর্তের বর্ণনা রয়েছে। সেখানে জিয়াউর রহমান তাঁর যুদ্ধের দায়িত্ব গ্রহণ এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
নিবন্ধ অনুযায়ী, ২৫ মার্চ রাতে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযান শুরু হওয়ার খবর পাওয়ার পর প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়।
কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের স্মৃতিও থাকছে
‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের স্মৃতিচারণ।
নিবন্ধে ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে জিয়াউর রহমান ওই সময়কার পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে একটি খাতার পাতায় স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম ঘোষণার বক্তব্য লেখা হয়েছিল।
নিবন্ধে ওই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বার্তা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে এই অংশ অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পর্যায়ে চট্টগ্রাম ও কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা সম্পর্কে একটি প্রত্যক্ষ স্মৃতিকথার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
পাঠ্যবইয়ে জিয়াউর রহমানের পরিচিতি
এনসিটিবির কারিকুলাম-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ পাঠ্যবইয়ের ২২ নম্বর গদ্যে লেখক পরিচিতি অংশে জিয়াউর রহমানকে সাবেক রাষ্ট্রপতি, সেনাপ্রধান, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং ‘বীর উত্তম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিবন্ধটির প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২৫ মার্চের গণহত্যা এবং শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল—এমন বর্ণনাও রয়েছে।
স্বাধীনতার ইতিহাসে একাধিক ব্যক্তির অবদান
এনসিটিবির দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব নয়। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের অবদানও সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ের প্রেক্ষাপট অংশে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এনসিটিবির ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একক ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক না করে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ভূমিকা ও ঘটনাপ্রবাহের আলোকে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের প্রতিক্রিয়া
বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বাসসকে বলেন, জিয়াউর রহমানের লেখা এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। তাঁর মতে, নিবন্ধটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে পারবে এবং পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত করা যৌক্তিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদও নিবন্ধটি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
এনসিসিসির সভায় অনুমোদন
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভাতেই নিবন্ধটি নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এনসিটিবি জানিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বই প্রস্তুতের কাজের অংশ হিসেবেই নিবন্ধটি যুক্ত করা হচ্ছে।
এনসিটিবির কর্মকর্তারা মনে করছেন, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রত্যক্ষ স্মৃতিকথা ও ঐতিহাসিক দলিল পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে আরও বিস্তৃত ধারণা লাভ করতে পারবে।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)














