Home অর্থনীতি দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত, তবু মাঠে সংকট: কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি

দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত, তবু মাঠে সংকট: কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি

0
9
দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত, তবু মাঠে সংকট: কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি

প্রকাশের তারিখ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেটের তারিখ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক | বিডি ভিউজ বাংলা

দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। কোথাও ডিলারের গুদামে সার না থাকলেও অন্যত্র অতিরিক্ত দামে তা বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির ঘটনাও ধরা পড়ছে।

এ পরিস্থিতিতে সার বিতরণ ব্যবস্থার অনিয়ম, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের উৎস চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

সংকট অনুসন্ধানে দুই কমিটি

সার সংকটের কারণ অনুসন্ধান ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৫ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি কমিটি গঠন করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি সার বিতরণ ও ডিলার ব্যবস্থাপনার মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

অন্যদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটি সারা দেশে ডিলারদের বরাদ্দ, সার উত্তোলন ও বিতরণের তথ্য সংগ্রহ করে সম্ভাব্য অনিয়ম শনাক্ত করছে।

মন্ত্রিপরিষদ কমিটির সদস্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, সারের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে কাজ করা হচ্ছে। ডিসি, কৃষি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে।

তিনি জানান, প্রত্যেক ইউনিয়নে একজন করে অতিরিক্ত ডিলার নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ডিলারদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে কিছু এলাকায় সার নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। রবিশস্যের জন্য অনেক কৃষক আগাম সার মজুত করছেন বলেও জানান তিনি।

সরকারি দামের চেয়ে দ্বিগুণে বিক্রি

সরকারি হিসাবে দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলেও বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের অতিরিক্ত দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঝিনাইদহে সরকার নির্ধারিত প্রতি কেজি টিএসপির দাম ২৭ টাকা হলেও বিভিন্ন বাজারে তা ৫০ থেকে ৫২ টাকা পর্যন্ত বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইভাবে ইউরিয়া, এমওপি ও ডিএপিও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।

সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃষক গোলাম নবী জানান, ডিলারের কাছে সরকারি দামে টিএসপি চাইলে তাকে সার শেষ বলে জানানো হয়। পরে অন্য এক কৃষকের মাধ্যমে একই সার ৫০ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়েছে।

শৈলকুপার রাণীনগর গ্রামের কৃষক ইসহাক আলী অভিযোগ করেন, ডিলারের কাছে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও সরকারি দামে সার পাওয়া যায় না। তবে বেশি টাকা দিলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যায়।

অভিযানে বিপুল সার জব্দ

সার অবৈধভাবে মজুতের অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রশাসনের অভিযান চলছে।

রাজশাহীর দুর্গাপুরে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৬৭০ বস্তা সার জব্দ করেছে উপজেলা প্রশাসন। এ ঘটনায় অবৈধভাবে সার মজুতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

দিনাজপুরের খানসামায় পৃথক অভিযানে অবৈধ ও অনুমোদিত সীমার বাইরে মজুত করা ১ হাজার ৫৭৭ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দুই ডিলারকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বরাদ্দ শেষ, তবুও কৃষকের চাহিদা পূরণ হয়নি

কুড়িগ্রামের রাজারহাটেও আমন মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। নাজিমখান ইউনিয়নের এক বিসিআইসি ডিলারের সেপ্টেম্বর মাসের ৪৪ টন ইউরিয়া মাত্র ১০ দিনেই শেষ হয়ে যায়।

অন্যদিকে উমর মজিদ ইউনিয়নের এক ডিলারকে বরাদ্দের অতিরিক্ত আরও ১০ টন সার উপবরাদ্দ দেওয়ার পরও কৃষকদের চাহিদা পূরণ হয়নি। ফলে প্রয়োজনের সময়ে সার না পেয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরছেন কৃষকরা।

মজুত ১১ লাখ ৯৩ হাজার টন

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দেশে মোট ১১ লাখ ৯৩ হাজার টন সার মজুত রয়েছে।

এর মধ্যে—

  • ইউরিয়া: ৩ লাখ ৯৪ হাজার টন
  • টিএসপি: ৩ লাখ ৩০ হাজার টন
  • ডিএপি: ২ লাখ ৯৪ হাজার টন
  • এমওপি: ১ লাখ ৭৫ হাজার টন

গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশে মোট সার মজুত ছিল ১১ লাখ ৯ হাজার টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এবার মজুত বেড়েছে প্রায় ৯২ হাজার টন।

অনিয়মে ‘জিরো টলারেন্স’

সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের মাঠে গিয়ে সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কমিটিও ডিলাররা নির্ধারিত সময়ে বরাদ্দের সার উত্তোলন করছেন কি না এবং উত্তোলনের পর তা যথাযথভাবে বিতরণ করছেন কি না—এসব তথ্য সংগ্রহ করছে।

গত শনিবার কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও জানিয়েছেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তাই সার নিয়ে কৃষকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে সার মজুত করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সার বিতরণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুত কিংবা নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কৃষকদের প্রকৃত ভোগান্তি দূর করতে মাঠপর্যায়ের তদারকি ও অভিযান কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: আমার দেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here