আন্তর্জাতিক নিউজডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা
প্রকাশের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেটের তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি এবং সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে রিয়াদ। হুথিদের ঠেকাতে সামরিকভাবে জবাব দিলে বৃহত্তর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সমঝোতার পথও ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে সৌদি আরবের সামনে কার্যকর বিকল্প কমে যাচ্ছে।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক মোহাম্মদ আল-বাশার মতে, পরিস্থিতি সৌদি পাল্টা হামলার দিকেই এগোচ্ছে এবং প্রতিদিন সেই সম্ভাবনা বাড়ছে।
বাব আল-মান্দেবের দিকে হুথিদের অগ্রগতি
চলতি সপ্তাহে হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরনগরী মোচার নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে গেছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপরিবহনের জন্য বাব আল-মান্দেব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। এই অঞ্চলে হুথিদের সামরিক উপস্থিতি বাড়ায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এরপর সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পর পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ইরাক থেকে হামলা চালানো হলেও কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এর দায় স্বীকার করেনি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন।
তেল সরবরাহেও বাড়ছে চাপ
হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকটের কারণে সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে।
ফলে পাইপলাইনে হামলা সৌদি আরবের জন্য শুধু নিরাপত্তা নয়, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তারও বড় হুমকি তৈরি করেছে।
এর আগেই সৌদি আরব আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল, ইরান-সমর্থিত হুথি ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সমন্বিতভাবে একাধিক হামলা চালাতে পারে।
সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থেকেও হুথিদের ঠেকানো কঠিন
সামরিক সক্ষমতার বিচারে সৌদি আরব হুথিদের তুলনায় অনেক শক্তিশালী। সৌদি বাহিনীর হাতে রয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত অস্ত্রব্যবস্থা ও বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ। বিপরীতে হুথিরা ইয়েমেনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী।
তবে দীর্ঘদিনের সংঘাতে হুথিরা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধকৌশল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি তারা ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে চাপে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে হুথিদের জনপ্রিয়তাও বেড়েছে।
সৌদি পাল্টা হামলা মানেই বড় যুদ্ধের আশঙ্কা
ইয়েমেনের সংঘাত শুরু হয় ২০১৪ সালে। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। পরের বছর হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সংঘাত ইয়েমেনকে ভয়াবহ মানবিক সংকটে ফেলেছে। নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি আরব যদি পূর্ণ শক্তিতে সামরিক অভিযান শুরু করে, তাহলে সংঘাত শুধু ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। ইরান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এতে জড়িয়ে পড়লে এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি যুদ্ধে যেতে চাইছে না
হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্র কতটা সামরিক সহায়তা দেবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক, হরমুজ প্রণালির সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন সরাসরি নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি দূরে সরে যায়নি। হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক পরামর্শক পাঠানোর তথ্যও এসেছে।
রাজনৈতিক সমাধানের পথও সংকুচিত
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ থাকলেও সেই পথ এখন প্রায় বন্ধ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত ধৈর্যের নীতি অনুসরণ করেছে এবং হুথি ও ইরানকে সতর্ক করেছে। কিন্তু হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা জবাব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার উৎস হিসেবে ইরাকের ভূমিকার বিষয়টি মোকাবিলায় বাগদাদের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করা হচ্ছে। তবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করছে।
এখন কী করবে রিয়াদ?
সৌদি আরব কখন এবং কী ধরনের পাল্টা পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী ইতোমধ্যে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। আগামী কয়েক দিন বা এমনকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অভিযান আরও তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করছেন কিছু বিশ্লেষক।
তবে আন্তর্জাতিকভাবে দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী সমর্থন ছাড়া সৌদি আরব সর্বাত্মক যুদ্ধে যাবে না—এমন মতও রয়েছে।
সব মিলিয়ে হুথিদের সামরিক অগ্রগতি, ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য সমন্বিত হামলা এবং লোহিত সাগর ও হরমুজকে ঘিরে উত্তেজনা সৌদি আরবকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সামরিকভাবে এগোলে বড় যুদ্ধের ঝুঁকি, আর রাজনৈতিক সমঝোতায় গেলে হুথিদের দাবির কাছে ছাড় দেওয়ার চাপ—দুই পথেই রিয়াদের সামনে বড় মূল্য দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।













