অর্থনীতি | নিজস্ব প্রতিবেদক | বিডি ভিউজ বাংলা
ভর্তুকির চাপ কমাতে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ভর্তুকি মূল্যে নিত্যপণ্য বিক্রির পাশাপাশি সাবান, ডিটারজেন্ট, চা, লবণ, আটা, ভোজ্যতেল ও মসলার মতো লাভজনক পণ্যের বাণিজ্যিক বিক্রিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকারি সংস্থাটি।
টিসিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব পণ্য শুধু ফ্যামিলি কার্ডধারীদের কাছেই নয়, সাধারণ ভোক্তাদের কাছেও বিক্রি করা হবে। একই সঙ্গে নিজস্ব অর্থে পণ্য কেনা, কম সুদে বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খোলা, নিয়মিত পণ্যের দাম সমন্বয় এবং পুরো কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টিসিবি এ পরিকল্পনার নাম দিয়েছে ‘মিশন জিরো’। সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে শুরুতেই বছরে প্রায় ৯৪০-৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে এবং ভর্তুকি প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা যাবে। দীর্ঘমেয়াদে ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
চার মাসে বাণিজ্যিক পণ্যে ২৮ কোটি টাকা লাভ
টিসিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে সাবান, ডিটারজেন্ট, কাপড় পরিষ্কারের সাবান ও লবণের বাণিজ্যিক বিক্রি শুরু হয়েছে। এসব পণ্য বিক্রি করে চার মাসে প্রায় ২৮ কোটি টাকা লাভ হয়েছে।
উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের কয়েকটি ধাপ বাদ পড়ছে। ফলে বাজারদরের তুলনায় কম দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন টিসিবি চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লাক্স ও মেরিল সাবান ৬৫ টাকার পরিবর্তে ৪৫ টাকা, হুইল পাউডার প্রতি কেজি ৮০ টাকার পরিবর্তে ৬৫ টাকা এবং লবণ ৪০-৪২ টাকার পরিবর্তে ৩৬ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে।
ডিলারদের অর্থ সরাসরি টিসিবির হিসাবে
আগে টিসিবির ডিলাররা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে টাকা জমা দিতেন। সেখান থেকে টিসিবির হিসাবে অর্থ আসতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগত।
নতুন ব্যবস্থায় ডিলারদের সরাসরি টিসিবির হিসাবে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে এখন প্রায় সাত দিনের মধ্যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন টিসিবি চেয়ারম্যান।
এর ফলে পণ্য কেনার জন্য ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমেছে। গত দুই মাসে ডাল ও চিনি কেনার জন্য কোনো ব্যাংকঋণ নেওয়া হয়নি বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
বছরে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব
টিসিবির হিসাব অনুযায়ী, নতুন বাণিজ্যিক পণ্যের ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা মুনাফা হতে পারে।
এ ছাড়া সরকার সময়মতো ভর্তুকির অর্থ ছাড় করলে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা, ডিলারদের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ গ্রহণে ১০০ কোটি টাকা, নিজস্ব গুদাম থেকে সরাসরি পণ্য সরবরাহে ২০ কোটি টাকা এবং টার্নওভার কর থেকে অব্যাহতি পেলে আরও ২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব করেছে টিসিবি।
ভর্তুকির ৭৩ শতাংশই পণ্যের দামে
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির মোট ভর্তুকির প্রায় ৭৩ শতাংশ সৃষ্টি হয় ক্রয়মূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রির কারণে। ব্যাংকঋণের সুদের কারণে ১৮ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ ভর্তুকি তৈরি হয়।
সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিতে হয় ভোজ্যতেলে। এরপর রয়েছে মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর।
২০২২-২৩ অর্থবছরে টিসিবি ৬ হাজার ৮৫১ কোটি টাকার পণ্য ৩ হাজার ৬২৯ কোটি টাকায় বিক্রি করে। এতে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ২২২ কোটি টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকি বেড়ে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ২ হাজার ৭১৭ কোটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৫১৪ কোটি টাকায় নেমে আসে।
‘মিশন জিরো’ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
টিসিবির নতুন বাণিজ্যিক উদ্যোগকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়নের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, টিসিবি যেন তার মূল দায়িত্ব থেকে সরে না যায়, তা নিশ্চিত করেই বাণিজ্যিক উদ্যোগ মূল্যায়ন করা উচিত। বাণিজ্যিক কার্যক্রমগুলো টিসিবির মূল কার্যক্রম থেকে আলাদাভাবে পরিচালনার পরামর্শও দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, কেউ যেন মুনাফার উদ্দেশ্যে পুনরায় বিক্রির জন্য টিসিবির পণ্য কিনতে না পারে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় টিসিবির ভূমিকা আরও জোরদার করার পাশাপাশি ভর্তুকির বোঝা কমানোর অন্যান্য পথও খুঁজতে হবে।
তার মতে, সরকারি বাণিজ্যিক উদ্যোগের অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে টিসিবির নতুন ব্যবসায়িক মডেল ভোক্তাদের উপকার করবে নাকি নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর জন্য সুযোগ তৈরি করবে, তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
বর্তমানে পাঁচ পণ্য ভর্তুকি মূল্যে
বর্তমানে টিসিবি সয়াবিন তেল, মসুর ডাল, চিনি, ছোলা ও খেজুর—এই পাঁচটি প্রধান পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি করছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সংস্থাটি ২২ কোটি লিটার সয়াবিন তেল, ২ দশমিক ২ লাখ টন মসুর ডাল, ১ দশমিক ১ লাখ টন চিনি, ১৪ হাজার টন ছোলা এবং ৪ হাজার ৪০০ টন খেজুর কেনার পরিকল্পনা করেছে।
বর্তমানে ৬ হাজার ৪৩৮ জন ডিলারের মাধ্যমে ৭২ দশমিক ৫৪ লাখ সক্রিয় ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের কাছে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)












