জাতীয় নিউজডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা
তাপমাত্রা বাড়তেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েছে সারাদেশ। নির্দিষ্ট কোনো শিডিউল ছাড়াই দিন-রাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
গ্রাহকদের অভিযোগ, দেশের কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটে কোথাও পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে। আবার বরফের অভাবে সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা। রংপুর, সিলেট, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও বরিশালে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি খারাপ বলে জানা গেছে।
৪ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে লোডশেডিং
বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত অধিকাংশ সময় ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো সময়ে লোডশেডিং ৪ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
রোববার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫১ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং করা হয় রেকর্ড ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। এর আগে গত ৩ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট।
রোববার দুপুর ১২টায় ১৫ হাজার ৭৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট। শনিবার রাত ১২টায় একই পরিমাণ চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬০৮ মেগাওয়াট।
গ্যাস সংকটে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়াই বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আগে দৈনিক ৯৯ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
গ্যাস থেকে আগে ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও বর্তমানে গড়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
এর পাশাপাশি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ রয়েছে। ফলে কেন্দ্রটি থেকে বর্তমানে মাত্র ৫০০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের আদানি থেকেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে।
বিভিন্ন অঞ্চলে জনজীবন বিপর্যস্ত
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
যশোরের অভয়নগরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পোলট্রি খাত। শনিবার নওয়াপাড়ার বুইকরা গ্রামের একটি খামারে প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চার শতাধিক মুরগি মারা গেছে বলে জানিয়েছেন খামারি।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে ১৫০ টাকার এক ক্যান বরফ এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকায়। বরফের অপেক্ষায় ঘাটে শত শত মাছধরা ট্রলার নোঙর করে আছে।
কুড়িগ্রাম ও সুনামগঞ্জেও দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ গ্রাহকরা। সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রংপুরে ঘন ঘন বিদ্যুৎবিভ্রাটে ব্যবসা-বাণিজ্য, হাসপাতাল-ক্লিনিকের সেবা এবং ছোট শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গরমে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগও বেড়েছে।
সিলেটে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হওয়ায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শনিবার ২২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৮১ মেগাওয়াট। ফলে ৪৩ মেগাওয়াট ঘাটতি সামাল দিতে বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় লোডশেডিং করতে হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের বন্দরেও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। সেখানে ঘণ্টায় তিন থেকে চারবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
এখনও কাটেনি গ্যাস সংকট
মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি। বর্তমানে টার্মিনালটি থেকে প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। দ্বিতীয় বয়লার চালু হলে আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুর্ঘটনার আগে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সরবরাহ কমে প্রায় ২১২ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুট হয়েছে।
তবে দেশের দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনও অনেক কম। ফলে গ্যাস সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সরাসরি পড়ছে।












