বিডি ভিউজ বাংলা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬
আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬
দেশজুড়ে যখন তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং চলছে, তখন অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার পেছনে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও বিদ্যুৎ খাতের তথ্য অনুযায়ী, এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জে প্রতিদিন প্রায় ৫৫ কোটি টাকা মূল্যের বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। বছরে এ ব্যয়ের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
অন্যদিকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবৈধভাবে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় সরকার বছরে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
দেশে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ বলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব রিকশায় সাধারণত ১২ ভোল্টের চার থেকে ছয়টি ব্যাটারি থাকে। প্রতিটি ব্যাটারি চার্জে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৯০০ থেকে ১১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়।
দিনে গড়ে আট ঘণ্টা চার্জে রাখলে একটি রিকশায় প্রায় ৮ থেকে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। ফলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর পেছনে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৮০০ থেকে ৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বছরে এর পরিমাণ প্রায় তিন লাখ মেগাওয়াট, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত পাঁচ শতাংশের সমান বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকায় ৪৮ হাজারের বেশি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে রয়েছে ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট এবং ৯৯২টি গ্যারেজ।
এর মধ্যে ওয়ারী বিভাগে ৩ হাজার ৫১৬টি, গুলশানে ২ হাজার ৬৪৩টি, মিরপুরে ৩ হাজার ৯৮৩টি, উত্তরা বিভাগে ১ হাজার ৩০৫টি এবং মতিঝিল বিভাগে ১ হাজার ৩৯০টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে।
এসব গ্যারেজে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১৫০টি পর্যন্ত রিকশা রাখা হয় এবং নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বৈধ চার্জিং স্টেশন ৩৩০০
অবাক করার মতো বিষয় হলো, অবৈধ রিকশার ব্যাটারি চার্জের জন্য দেশে সরকারি অনুমোদিত ৩ হাজার ৩০০টি চার্জিং স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ডিপিডিসি) এলাকার অধীনেই রয়েছে ২ হাজার ২০১টি বৈধ চার্জিং স্টেশন।
তবে বৈধ স্টেশনগুলোর তুলনায় অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা অনেক বেশি। কোথাও কোথাও বিদ্যুতের খুঁটি থেকে সরাসরি সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে বাড়ছে লোডশেডিং
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট চলছে। ১৮ থেকে ১৯ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। ফলে কোথাও কোথাও ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিং শুরু হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে।
অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা: জ্বালানিমন্ত্রী
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
তিনি বলেন, অবৈধ অটোরিকশার কারণে এমন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা আগে ছিল না। মধ্যরাতে এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী আরও বলেন, অধিকাংশ অটোরিকশা অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করছে। এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে সংশ্লিষ্টদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সিপিডির গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, দেশের কষ্টার্জিত বিদ্যুতের অন্তত পাঁচ শতাংশ অবৈধ অটোরিকশার পেছনে ব্যয় হচ্ছে।
সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট খালিদ মাহমুদ জানান, ব্যাটারি চার্জের জন্য প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি এসব রিকশার কারণে নগরীতে যানজট, দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত ক্ষতি বাড়ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, অটোরিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারির মাত্র ২০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং করা হয়। বাকি ব্যাটারির বর্জ্য পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া চার্জ দিলে জরিমানা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
তিনি জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মাধ্যমে এসব ই-রিকশা নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। তবে শর্ত থাকবে—সৌরবিদ্যুৎ ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যাবে না।
শর্ত ভঙ্গ করলে জরিমানা করা হবে। নিবন্ধনের পর নিয়ম না মানলে নিবন্ধন নবায়নও করা হবে না বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা এবং সব উপজেলায় ই-রিকশাকে নিবন্ধন, আইন ও নবায়নের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকায় ৮টি অটোরিকশা জোন
রাজধানীর অটোরিকশাগুলোকে আটটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চারটি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে চারটি জোন থাকবে।
প্রতিটি জোনের ই-রিকশায় আলাদা রং থাকবে। এক জোনের রিকশা যাতে অন্য জোনে যেতে না পারে, সেজন্য জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নিবন্ধনের সময় প্রতিটি ই-রিকশায় কিউআর কোড দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩,৫৯২ মেগাওয়াট
বিদ্যুৎ সংকটের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গত ১১ ও ১২ আগস্ট। ওই সময়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়।
১১ আগস্ট রাত ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৯৩১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট।
এর আগে রাত ৯টায় ১৮ হাজার ৪৩ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৫ হাজার ৩৬ মেগাওয়াট। তখন ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট।
সরকারের নতুন উদ্যোগ
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট, শপিংমল ও বিপণিবিতান বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এলএনজি সরবরাহ ও গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে বিদ্যুৎ চুরি, অবৈধ চার্জিং স্টেশন এবং অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাগাম টানতে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।
সূত্র: আমার দেশ, সিপিডি












