Home মতামত অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা

অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা

0
26
অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি: উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার পরিবর্তনের পর দেশের মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করেছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণের পথ এখনও দীর্ঘ। এ সময়ে সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা এবং জবাবদিহি—সবই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে গঠনমূলক সমালোচনার পরিবর্তে গুজব, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

আমার বিশ্বাস, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু তথ্য বিকৃতি, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন কিংবা যাচাইহীন অভিযোগের ওপর রাজনীতি কখনোই সুস্থ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে না। বরং এটি জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল করে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগের সফলতা বা সীমাবদ্ধতা নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে—যে কোনো সরকারের কাজের মূল্যায়ন হওয়া উচিত বাস্তব ফলাফল, তথ্য এবং নীতির ভিত্তিতে; গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার ভিত্তিতে নয়।

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন মানুষের মতপ্রকাশের সুযোগ বাড়িয়েছে, তেমনি মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। একটি সম্পাদিত ছবি, একটি কাটা ভিডিও কিংবা একটি যাচাইহীন পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। পরে সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও জনমনে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তার ক্ষতি সহজে পূরণ হয় না।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা অবশ্যই থাকবে। তবে সেই সমালোচনা হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক, প্রমাণনির্ভর এবং শালীন। একইভাবে সরকারকেও সমালোচনাকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অপপ্রচারের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিপক্বতার পরিচয়।

আজ আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়; বরং সত্য ও মিথ্যার লড়াই। যে সমাজে গুজব সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জনগণ বিভ্রান্ত হয়।

গণমাধ্যমেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো নিরপেক্ষতা, তথ্য যাচাই এবং জনস্বার্থ। সংবাদকে সংবাদ হিসেবেই উপস্থাপন করতে হবে; মতামতকে মতামত হিসেবে। এই সীমারেখা যত স্পষ্ট হবে, জনগণের আস্থাও তত বাড়বে।

আমরা যদি সত্যিই একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে—কিন্তু তা যেন কখনোই মিথ্যা, বিদ্বেষ কিংবা অপপ্রচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হয়। মতের লড়াই হোক যুক্তির মাধ্যমে, ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যমে নয়।

আমি বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে রাজনৈতিক দল, সরকার, বিরোধী দল, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণের ওপর। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ চিরস্থায়ী। তাই জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়াই আমাদের সবার দায়িত্ব।

গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো—সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। একটি সচেতন জাতি কখনো গুজবের ওপর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে না; তারা নির্মাণ করে সত্য, যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে।

শাহরিয়ার বেহেস্তী

সম্পাদক ও প্রকাশক, বিডি ভিউজ বাংলা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here