Home জাতীয় বিএনপি সরকারের ছয় মাসে ব্যর্থতার অভিযোগ বিরোধী দলের

বিএনপি সরকারের ছয় মাসে ব্যর্থতার অভিযোগ বিরোধী দলের

0
6
বিএনপি সরকারের ছয় মাসে ব্যর্থতার অভিযোগ বিরোধী দলের

নিজস্ব প্রতিবেদক | বিডি ভিউজ বাংলা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১০ সকাল
আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১০ সকাল

গত ছয় মাসে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী দলগুলোর নেতারা। জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, গণভোটের রায় অস্বীকার, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনীহা, দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।

তাদের দাবি, চলমান সংকট সমাধানে বিরোধী দলের পরামর্শ গ্রহণ করে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

গণভোটের রায় অস্বীকারের অভিযোগ

সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা। এর মাধ্যমে সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ারের দাবি, সরকারের ছয় মাসে উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা দেখা যায়নি। তার অভিযোগ, বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও দুর্নীতি বেড়েছে। কার্ড, ঠিকাদারি ও নিয়োগে দলীয় লোকদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনীতির স্থবিরতা জনগণের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। রপ্তানি ও বিনিয়োগেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই বলে দাবি করেন তিনি।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ব্যর্থতা থাকলে জনগণের সামনে তা স্বীকার করতে হবে। বিরোধী দলগুলোর দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে চলমান সংকট সমাধানে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকারও দাবি জানান তিনি।

‘হযবরল অবস্থায় সরকার’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ এমপি বলেন, সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে ‘হযবরল’ পরিস্থিতি দেখা যায়।

তার অভিযোগ, জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। মাদক নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।

আতিক মুজাহিদ বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, গত ছয় মাসে তার খুব বেশি প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং রাজনৈতিক অঙ্গনে আগের ধাঁচের কথাবার্তা ও কর্মকাণ্ড হতাশাজনক।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে রেখে পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি বিরোধী দলের মতামতকে সম্মান করে জাতীয় ইস্যুতে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

‘ভিন্নদিকে হাঁটছে সরকার’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, সরকারের গত ছয় মাসের কর্মকাণ্ডে সফলতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো গুমের ঘটনা নজরে আসেনি এবং বিরোধী মত দমনে সরকারের হাইকমান্ড থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি—এটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে সরকারের সমালোচনা করেন তিনি।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে জালালুদ্দীন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালেও দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।

তার দাবি, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই অবস্থান থেকে সরে আসা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

‘সরকার অযোগ্যদের দিয়ে দেশ চালাচ্ছে’

জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের প্রধান নূরুন্নিসা সিদ্দীকা এমপি বলেন, সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডে তারা সন্তুষ্ট নন।

তার অভিযোগ, সর্বত্র দলীয়করণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

সরকার ‘অযোগ্যদের দিয়ে দেশ চালাচ্ছে’ মন্তব্য করে নূরুন্নিসা সিদ্দীকা বলেন, যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনা করা উচিত।

‘সরকার শুরুতেই প্রতারণা করেছে’

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এমপি অভিযোগ করেন, সরকার ক্ষমতায় এসে সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে শুরুতেই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাওয়া হলেও পরবর্তীতে সেই অবস্থান থেকে সরে আসা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে মানুষ পরিবর্তন প্রত্যাশা করলেও আবারও দলীয়করণের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে।

তার মতে, মানুষের আস্থা ফেরাতে প্রথমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।

‘সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক’

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারকে মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস কম সময় নয়। তবে এই সময়ের মধ্যেই সরকারের পূর্ণাঙ্গ সফলতা বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত হিসাব করাও ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, শাসনব্যবস্থা, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মতো সূচকে সরকারের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মঞ্জুর দাবি, এসব সূচকে গত ছয় মাসে আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা হতাশাজনক পর্যায়ে রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং বেকারত্বও বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান। প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়িতা ও সময়ানুবর্তিতা, খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় পুরোহিতদের ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তার সার্বিক মূল্যায়ন, সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক।

‘বিশ্বাসঘাতকতা করছে সরকার’

বিএনপি সরকারের ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশার ওপর ভর করে ক্ষমতায় এসে বিএনপি মাত্র ছয় মাসেই জুলাই চেতনার সঙ্গে বেঈমানি করেছে।

রাষ্ট্র সংস্কারে গণভোটের রায় কার্যকর না করে জনগণের রায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে শিল্প-কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

ডা. ইরান বলেন, সরকারকে অবিলম্বে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-জ্বালানি সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসা পরিহার করতে হবে।

বিরোধীদের মূল অভিযোগ

  • গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা
  • বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ
  • চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বৃদ্ধি
  • আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি
  • গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট
  • দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি
  • বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা
  • রাজনৈতিক সহনশীলতার ঘাটতি

বিরোধী দলগুলোর নেতারা বলছেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে দলীয় সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। চলমান সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সূত্র: আমার দেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here