সম্পাদকীয়
বিএনপিতে ‘ডানপন্থী’ গুপ্ত ট্যাগ: মতাদর্শের ভিন্নতা কি বিভাজনের অস্ত্র হচ্ছে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও জাতীয়তাবাদী ধারার প্রতিনিধিত্বকারী দল হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ পথচলায় দলটির ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের মানুষের উপস্থিতি ছিল—ডানপন্থী, বামপন্থী ও মধ্যপন্থী। গণতান্ত্রিক একটি রাজনৈতিক দলে মতের বৈচিত্র্য থাকাটাই স্বাভাবিক। বরং সুস্থ মতপার্থক্য দলকে আরও পরিণত করতে পারে।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন মতাদর্শগত পার্থক্যকে রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে ‘ট্যাগ’ দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় বিএনপির ভেতরে জাতীয়তাবাদী বা তুলনামূলক রক্ষণশীল অবস্থানে থাকা নেতাকর্মীদের ‘ডানপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করে কোণঠাসা করার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যদি সত্যিই এমন কোনো প্রবণতা তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
‘ডানপন্থী’ কি এখন গুপ্ত ট্যাগ?
রাজনীতিতে কাউকে ‘ডানপন্থী’, ‘বামপন্থী’ কিংবা ‘মধ্যপন্থী’ বলা নিজে কোনো অপরাধ নয়। রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আলোচনা গণতন্ত্রেরই অংশ। কিন্তু কোনো নেতাকর্মীর বক্তব্য বা অবস্থানকে বিশ্লেষণ না করে শুধু ‘ডানপন্থী’ পরিচয় দিয়ে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা বা রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা হলে সেটি ভিন্ন বিষয়।
এ ধরনের গুপ্ত ট্যাগিং দীর্ঘমেয়াদে দলের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে। নেতাকর্মীরা তখন নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার পরিবর্তে কোন বক্তব্যে কে কী ট্যাগ দেবে—সেটি নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়তে পারেন।
একটি বড় রাজনৈতিক দলের জন্য এটি কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়।
বিএনপির সামনে মূল প্রশ্ন
বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—দলটি তার রাজনৈতিক পরিচয় ও আদর্শের জায়গায় কতটা স্পষ্ট থাকবে।
জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা—এসব প্রশ্নে দলের অবস্থান পরিষ্কার থাকা জরুরি। একই সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিক স্বাধীনতার মতো বিষয়েও সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতি নির্ধারণ প্রয়োজন।
অর্থাৎ, আধুনিকতা গ্রহণ করা আর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বিসর্জন দেওয়া—এক বিষয় নয়।
বিএনপির ভেতরে উদার, মধ্যপন্থী কিংবা বামঘরানার চিন্তার মানুষ থাকতেই পারেন। তাদের মতামতও দলের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু কোনো একটি গোষ্ঠী যদি অন্য একটি মতাদর্শকে ‘গুপ্ত ট্যাগ’ দিয়ে দুর্বল করার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
বিভাজন নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা
বিএনপির ইতিহাসে মতপার্থক্য নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু একটি দলকে শক্তিশালী করে তার অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমত সহ্য করার সক্ষমতা।
তাই বিএনপির জন্য এখন প্রয়োজন ‘কে ডানপন্থী, কে বামপন্থী’—এই হিসাবের চেয়ে কে দলের নীতি, গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে কতটা কার্যকর—সেটি বিবেচনা করা।
কাউকে ‘ডানপন্থী’ বলে চিহ্নিত করা যেমন কোনো অপরাধ নয়, তেমনি ‘বামপন্থী’ বা ‘উদারপন্থী’ হওয়াও অপরাধ নয়। অপরাধের জায়গা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক পরিচয়ের এই শব্দগুলোকে অপমান, অপপ্রচার কিংবা সংগঠনের ভেতরে কাউকে কোণঠাসা করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দলের নেতাকর্মী ও জনগণের আস্থা। সেই আস্থা ধরে রাখতে হলে দলের ভেতরে প্রয়োজন স্বচ্ছ রাজনৈতিক বিতর্ক, আদর্শের স্পষ্টতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান।
ট্যাগ দিয়ে প্রতিপক্ষ তৈরি নয়—যুক্তি দিয়ে মতের লড়াই হোক।
বিভাজন নয়—জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত আরও শক্তিশালী হোক।
— সম্পাদকীয় বিভাগ
বিডি ভিউজ বাংলা














