Home সর্বশেষ সংবাদ চার সন্তানকে একা বড় করা বাবার শেষকৃত্য করল পুলিশ, কেউ এলেন না

চার সন্তানকে একা বড় করা বাবার শেষকৃত্য করল পুলিশ, কেউ এলেন না

0
6
চার সন্তানকে একা বড় করা বাবার শেষকৃত্য করল পুলিশ, কেউ এলেন না

আন্তর্জাতিক নিউজ ডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা

📌 প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬
📌 আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৬

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে একাই বড় করেছিলেন ভারতের মধ্যপ্রদেশের ঘনশ্যাম। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে সেই চার সন্তানের কেউই পাশে থাকেননি। এমনকি ৭০ বছর বয়সে মৃত্যুর পর শেষবারের মতো বাবার মরদেহ দেখতেও আসেননি তারা। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সম্পন্ন হয় তার শেষকৃত্য।

ভারতের ভোপালের ‘আপনা ঘর’ বৃদ্ধাশ্রমে জীবনের শেষ চার বছর কাটিয়েছেন ঘনশ্যাম। গত ৪ আগস্ট সেখানে তার মৃত্যু হয়।

ঘনশ্যাম ইন্দোরে সাইকেলের টায়ার ও টিউব বিক্রির ছোট ব্যবসা করতেন। তার একটি ছোট বাড়িও ছিল। স্ত্রী মারা যাওয়ার সময় সবচেয়ে ছোট মেয়ের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর। এরপর সন্তানদের মানুষ করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি।

কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সন্তানদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভালোবাসা ও যত্ন পাননি।

মৃত্যুর পরও এলেন না সন্তানরা

ঘনশ্যামের মৃত্যুর পর বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তার পরিবারের সদস্যদের খবর দেন এবং বারবার ভোপালে এসে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে নানা অজুহাত দেখানো হয়।

একপর্যায়ে পরিবার থেকে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, তারা যেন নিজেরাই ঘনশ্যামের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে মৃত্যুসনদ পাঠিয়ে দেন।

‘আপনা ঘর’-এর পরিচালনাকারী মাধুরী মিশ্র বলেন, ঘনশ্যামের সবচেয়ে ছোট মেয়ের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তার স্ত্রী মারা যান। তার ভাষায়, “একসময় একজন বাবা চার-পাঁচটি সন্তানকে মানুষ করতে পারতেন। অথচ আজ চার সন্তান মিলে একজন বাবার দেখাশোনা করতে পারল না।”

সম্পত্তি ভাগের পর সম্পর্কও শেষ?

মাধুরী মিশ্র জানান, ইন্দোরে ঘনশ্যামের একটি ছোট বাড়ি ছিল। পরে সেটি বিক্রি করে অর্থ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

বৃদ্ধাশ্রম থেকে ঘনশ্যামের দেওয়া জরুরি যোগাযোগ নম্বরেও ফোন করা হয়। কিন্তু ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এমন উত্তর আসে, যা কর্তৃপক্ষকে আরও বিস্মিত করে।

পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, “আমি তাকে চিনি না। আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”

এমনকি বাবার বাড়ির টাকা ভাই-বোনদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার পর ঘনশ্যামের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক নেই বলেও জানানো হয়।

বাস টার্মিনাল থেকে বৃদ্ধাশ্রমে

বৃদ্ধাশ্রমে আসার সময় ঘনশ্যাম আংশিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন। কথা বলতে তার কষ্ট হতো এবং ঠিকমতো হাঁটতেও পারতেন না।

সন্তানরা তাকে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসেনি। ইন্দোর থেকে বাসে ভোপালের আইএসবিটিতে আসার পর কয়েকজন তরুণ সমাজকর্মী তাকে দেখতে পান। পরে তারাই ঘনশ্যামকে ‘আপনা ঘর’-এ নিয়ে আসেন।

যে বাবা একসময় নিজের চার সন্তানকে হাঁটতে শেখাতে হাত ধরে পাশে ছিলেন, জীবনের শেষ বয়সে সেই মানুষটিকেই আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় একটি বাস টার্মিনালে প্রায় একা পড়ে থাকতে হয়েছিল।

পরবর্তী চার বছর বৃদ্ধাশ্রমই হয়ে ওঠে তার বাড়ি। অসুস্থ হলে কর্তৃপক্ষ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেত এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করত। কিন্তু সন্তানদের কেউ তাকে দেখতে আসেননি।

শেষকৃত্য করল পুলিশ

গত ৪ আগস্ট ঘনশ্যামের মৃত্যু হয়। বৃদ্ধাশ্রমে দীর্ঘদিন মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কর্তৃপক্ষ পরিবারের অপেক্ষায় ছিলেন। ইন্দোরের পঞ্চবটি এলাকার ঠিকানায় যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।

শেষ পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় ঘনশ্যামের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।

তবে মৃত্যুর পরও ঘটনার শেষ হয়নি। এখন তার পরিবার মৃত্যুসনদ চাইছে।

মাধুরী মিশ্র জানিয়েছেন, তিনি ঘনশ্যামের মৃত্যুসনদ পরিবারের হাতে তুলে দিতে চান না। তার প্রশ্ন, “তিনি জীবিত থাকাকালে দেখতে আসেননি, মৃত্যুর পরও এলেন না—তাহলে এখন কেন তার মৃত্যুসনদ নিতে আসছেন?”

ঘনশ্যামের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সম্পত্তির সঙ্গে মানবিকতার সম্পর্ক নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

📌 তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here