জাতীয় নিউজডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও চাহিদা অর্ধেকের কাছাকাছি উঠলেই তা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ খাত। গ্যাসের ঘাটতি, কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র পর্যাপ্ত পরিমাণে চালানোর মতো আর্থিক সক্ষমতার অভাবে সারা দেশে বেড়েছে লোডশেডিং।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (PGCB) তথ্যমতে, সোমবার দিবাগত রাত ১টায় দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়। ওই সময় ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ২৩ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাবে, সোমবার ২৪ ঘণ্টায় গড় বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। সবচেয়ে বেশি ৫৪৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে ঢাকা অঞ্চলে। ঘণ্টার হিসাবে সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলেও পরিস্থিতি ছিল নাজুক।
আগস্টের শুরু থেকেই লোডশেডিং পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। এর আগে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট এবং ৩ আগস্ট ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট। গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল মাত্র ৪৮৮ মেগাওয়াট।
গ্যাস সংকটে বিপাকে বিদ্যুৎ উৎপাদন
দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু গ্যাসের সংকটে বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দুর্ঘটনার আগে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হলেও পরে তা নেমে আসে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে।
এলএনজি টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে এখনো আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এর মধ্যে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে একটি আমদানি করা কার্গো নির্ধারিত সময়ে যুক্ত হতে না পারায় গ্যাস সরবরাহে আবারও চাপ তৈরি হয়েছে।
কমেছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেখানেও রয়েছে নানা সমস্যা। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট হলেও উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট।
পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে যাওয়ায় উৎপাদন কমে গিয়েছিল। ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও কয়েক দিন ধরে সরবরাহ কমেছে। সাধারণত ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটে।
এ ছাড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে এবং বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ রয়েছে।
তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনেও আর্থিক সংকট
গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন কমে গেলে দ্রুত ঘাটতি পূরণের অন্যতম উপায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। কিন্তু এসব কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ইউনিটপ্রতি প্রায় ২০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
ফলে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে লোডশেডিং কমাতে তেলচালিত কেন্দ্র চালানো হলেও রাত গভীর হলে অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মধ্যরাতের পর কোনো কোনো সময়ে লোডশেডিং আবার বেড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির বকেয়া প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনাই প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন করে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রেও সমস্যায় পড়ছে। ফলে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি ও অর্থের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গরম বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বর্তমান সংকট আরও তীব্র হয়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও নাজুক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: ইত্তেফাক












