Home অর্থনীতি জুলাই-জুনের বদলে এপ্রিল-মার্চে অর্থবছর করার উদ্যোগ সরকারের

জুলাই-জুনের বদলে এপ্রিল-মার্চে অর্থবছর করার উদ্যোগ সরকারের

0
12
জুলাই-জুনের বদলে এপ্রিল-মার্চে অর্থবছর করার উদ্যোগ সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক | বিডি ভিউজ বাংলা

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ সকাল
সর্বশেষ আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৫ সকাল

দেশের প্রচলিত জুলাই-জুন অর্থবছর পরিবর্তন করে এপ্রিল-মার্চ করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব শিগগিরই মন্ত্রিসভায় তোলা হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন।

বর্তমানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন, বাজেট প্রণয়ন পদ্ধতি, কর ব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, তা পর্যালোচনা করছে।

পর্যালোচনা শেষে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে আগামী অর্থবছর থেকেই নতুন সময়সীমা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিন মাসে দুই অর্থবছরের কাজ চলবে

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, চলতি অর্থবছর কীভাবে বা কোন মাসে শেষ করা হবে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন পর্যায়ের মতামত নেবেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাসে দুই অর্থবছরের কাজ পাশাপাশি চলবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থবছর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। অর্থ আইনেও অর্থবছরকে এভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

কেন অর্থবছর পরিবর্তনের চিন্তা

সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক বছর ধরেই বিশেষজ্ঞ ও ঠিকাদাররা জুলাই-জুন অর্থবছর পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন।

অর্থবছরের শেষ সময়ে, বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত, বাংলাদেশের আবহাওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অনুকূলে থাকে না। এ সময় সাধারণত বৃষ্টিপাত হয়। জুনে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি, নিম্নমানের কাজ এবং অর্থের অপচয়ের ঘটনা ঘটে।

বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের সঙ্গে অর্থবছরের শেষ তিন মাসের বড় একটি অংশ মিলে যাওয়ায় সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা তৈরি হয়।

অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করা হলে শেষ তিন মাস পড়বে জানুয়ারি থেকে মার্চে। এতে বর্ষাকালকে অর্থবছরের একেবারে শেষ প্রান্ত থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, দরপত্র, কাজ বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধের সময়সূচি নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি হবে।

উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আনার লক্ষ্য

অর্থবছরের সময় এগিয়ে আনা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা ও অপচয় কমবে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।

টিবিএসকে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন পক্ষ অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে। এর কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে।

তাঁর মতে, বর্তমান অর্থবছরের শেষ তিন মাস বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। জুনে ঠিকাদাররা বিল পাওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে কাজ করেন। বর্ষার কারণে কাজের মানও ঠিক থাকে না। এতে অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে বাড়তি সময় লাগে।

ফাহমিদা খাতুনের মতে, অর্থবছর এগিয়ে আনার উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে এর সঙ্গে অন্যান্য খাতেও ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে।

রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন

অর্থবছর পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উন্নয়ন বাজেটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজস্ব আদায়, কর নির্ধারণ, আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট, সরকারি হিসাব, বাজেট প্রণয়ন, বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন সরকারি সফটওয়্যারেও পরিবর্তন আনতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বর্তমানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকা এবং সরকারের রাজস্ব ও ব্যয় পরিকল্পনাও জুলাই-জুন কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

ফলে পুরোনো অর্থবছরের হিসাব কীভাবে বন্ধ হবে, নতুন অর্থবছরের মেয়াদ কত হবে এবং চলমান বাজেটের সঙ্গে নতুন সময়সীমার সমন্বয় কীভাবে করা হবে—এসব বিষয় নির্ধারণে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময় প্রয়োজন হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছর পরিবর্তনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনিক ও হিসাব ব্যবস্থার রূপান্তর। সরকারি হিসাবরক্ষণ, বাজেট সফটওয়্যার, কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং ও আর্থিক রিপোর্টিংয়ের পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনার সময়সূচিও পরিবর্তন করতে হবে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বার্ষিক কর্মসম্পাদন সূচক, ক্রয় পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের অর্থছাড়ের সময়সূচি নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প পরিচালকদের ওপর প্রভাব

অর্থবছর পরিবর্তন হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে দরপত্র, কাজের সময়সীমা ও বিল পরিশোধের চক্র নতুন করে সাজাতে হবে।

বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক প্রকল্পে অর্থবছরের শেষদিকে বিল পরিশোধের চাপ তৈরি হয়। অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হলে সেই চাপ মার্চের দিকে চলে যাবে।

এতে বছরের কোন সময়ে দরপত্র আহ্বান করা হবে, কখন কার্যাদেশ দেওয়া হবে এবং কোন সময়ে কাজের সর্বোচ্চ গতি থাকবে—এসব নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে।

প্রকল্প পরিচালকদের ক্ষেত্রেও বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ও অর্থছাড়ের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করতে হবে। জুলাই-জুন ধরে নির্ধারিত চলমান প্রকল্পগুলোর মেয়াদ কীভাবে নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

২০১০ সালেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, এর আগে ২০১০ সালেও অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এবার সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকার আরও কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ, প্রক্রিয়াগত বিলম্ব কমানো এবং বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে সব মন্ত্রণালয়ে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাস্তবায়ন অগ্রগতির ভিত্তিতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে লাল, হলুদ ও সবুজ—এই তিন রঙের সংকেত ব্যবহার করে শ্রেণিবদ্ধ করবে ড্যাশবোর্ড।

একই সঙ্গে জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ ও নির্মাণকাজের রেট শিডিউলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তাব ছিল জানুয়ারি-ডিসেম্বর

অর্থবছর পরিবর্তনের দাবি রাজনৈতিকভাবেও নতুন নয়। ২০২৬ সালের বাজেট প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জুলাই-জুন অর্থবছরের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার প্রস্তাব দিয়েছিল।

দলটির প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ সালের ছায়া বাজেটে অর্থবছর পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজস্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়।

এরপর ২৯ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই-জুন অর্থবছরের কারণে অর্থবছরের শেষদিকে অনেক সময় শুধু বিলের হিসাবে কাজ শেষ করা হয়।

তিনি ক্যালেন্ডার বছর, অর্থাৎ জানুয়ারি-ডিসেম্বরের মধ্যে অর্থবছর রাখার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে অর্থবছর শেষ হওয়ার অন্তত তিন মাস আগে সম্পূরক বাজেট এবং চার মাস পরপর সংসদে বাজেট বাস্তবায়ন পর্যালোচনার প্রস্তাবও দেন।

শুধু অর্থবছর পরিবর্তনেই কি অপচয় বন্ধ হবে?

অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তন করলেই জুনের শেষদিকে তড়িঘড়ি ব্যয়, প্রকল্পে বিলম্ব, নিম্নমানের কাজ বা সরকারি অর্থের অপচয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হবে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তাঁদের মতে, প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, ক্রয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের পুরো ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের সঙ্গে অন্যান্য খাতেও কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। সব পরিবর্তন একবারে সম্ভব না হলেও ধাপে ধাপে অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া যেতে পারে।

অর্থবছর এপ্রিল-মার্চে পরিবর্তনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তন হবে। তবে এর বাস্তবায়নের আগে আইন, হিসাবরক্ষণ, করব্যবস্থা, বাজেট প্রণয়ন ও উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করে একটি সুস্পষ্ট রূপান্তর পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here