নিজস্ব প্রতিবেদক | বিডি ভিউজ বাংলা
প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২৩ আগস্ট ২০২৬
রংপুর মহানগরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় ওই শিক্ষকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার পর তাকে এবং পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা সম্পর্কে আত্মীয় এবং দুজনের বাড়িই রংপুর নগরের কোতোয়ালি থানার মাছুয়াপাড়া এলাকায়। রোববার ভোরে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
যেভাবে হত্যাকাণ্ড
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে ইয়াবা সেবন করছিলেন। ছাদে মানুষের চলাচলের শব্দ শুনে গণপতি সেখানে গেলে তিনি দুজনকে দেখতে পান এবং তাদের উপস্থিতির কারণ জানতে চান।
দুজনই ওই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় গণপতি তাদের চিনতেন এবং তারা তাকে ‘স্যার’ বলে ডাকত। ধরা পড়ে যাওয়ার পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গামছা দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে গণপতিকে শ্বাসরোধে হত্যা করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ধস্তাধস্তি ও গোঙানির শব্দ শুনে ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাকেও সিঁড়িতে কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে বাবা-মায়ের চিৎকার শুনে তাদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৩) ঘর থেকে বের হলে তাকেও হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানায়, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র প্রিয়ম (১২)-কে অভিযুক্তরা চিনত। সিদ্ধার্থের ছোট ভাই অপূর্বর সঙ্গে প্রিয়ম খেলাধুলা করত। প্রিয়ম তাদের চিনে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার মুখে বালিশ চাপা দেওয়া হয় বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পরও স্বাভাবিক আচরণ
পুলিশ কমিশনার জানান, চারজনকে হত্যার পরও অভিযুক্তদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। তারা প্রথমে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায়। এরপর প্রিয়মকে যে কক্ষে হত্যা করা হয়েছিল, সেই কক্ষের বাথরুমে গিয়ে দুজন গোসল করে।
গোসলের পর তারা ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর খায় এবং ইয়াবা সেবন করে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে অভিযুক্তরা এটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে। তারা ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে।
পুলিশ জানায়, সিদ্ধার্থ দীর্ঘদিন ধরে একটি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে স্বর্ণের কারিগর হিসেবে কাজ করায় আসল ও নকল স্বর্ণ চেনার অভিজ্ঞতা ছিল। লুটের সময় আগুন দিয়ে একটি চুড়ি পুড়িয়ে স্বর্ণ যাচাই করা হয় বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
আঙুলের ছাপ মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার আগে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশের দাবি।
পরে জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট তুলনামূলক ফাঁকা থাকায় লুণ্ঠিত স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা বেরিয়ে যায়। যাওয়ার পথে একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় স্বর্ণালংকারগুলো লুকিয়ে রাখে। পরে অভিযান চালিয়ে সেগুলো উদ্ধার করে পুলিশ।
ইয়াবার আলামত থেকেই সন্দেহ
পুলিশ কমিশনার বলেন, প্রথম দিকে ঘটনাটি ডাকাতি নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নিয়ে পুলিশ দ্বিধায় ছিল। তবে ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের আলামত, অর্ধেক খাওয়া শসা এবং আগুন দিয়ে পোড়ানো স্বর্ণের চুড়ি পাওয়ার পর তদন্তে নতুন দিক উন্মোচিত হয়।
এরপর স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। তদন্তে সিদ্ধার্থের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশ কমিশনার আরও জানান, ঘটনাস্থলে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।
সূত্র: পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য












