Home জাতীয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাস কেমন কাটল

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাস কেমন কাটল

0
9
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম ৬ মাস কেমন কাটল

নিজস্ব প্রতিবেদক | বিডি ভিউজ বাংলা

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০০ সকাল
আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০০ সকাল

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় আসে দলটি। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে।

সরকার গঠনের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়—দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। ছয় মাস পর এসব অগ্রাধিকার কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে এখন চলছে নানা আলোচনা।

গত ছয় মাসে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কয়েকটি উদ্যোগ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাসেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হয়নি বলে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসের প্রতিবেদনে গণপিটুনি, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং কারাগারে মৃত্যুর একাধিক ঘটনা উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে ২২০ জন নারী ও শিশু নির্যাতন বা সহিংসতায় মারা গেছেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৯টি, কারাগারে বন্দি বা বিচারাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫৫ জন এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। একই সময়ে মব সহিংসতায় মারা গেছেন ১২০ জন।

এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা দাঁড়িয়েছে ৮৩০টিতে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫২৯টি। একই সময়ে ১ হাজার ৬২১ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

অর্থনীতিতে সংস্কারের চেষ্টা

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং বিনিয়োগ সংকট ছিল সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উত্তরণের জন্য ছয় মাস খুব বেশি সময় নয়। তবে এ সময়ে সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে এগিয়েছে এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেছে।

তবে দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের চাপ এখনো রয়েছে। বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভোগান্তি

সরকারের প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হওয়া বিষয়গুলোর একটি ছিল বিদ্যুৎ খাত। লোডশেডিং এবং অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সরকার সমালোচনার মুখে পড়ে।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে গত কয়েক মাসে লোডশেডিং তীব্র হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এর পাশাপাশি জ্বালানি সংকটও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ার পাশাপাশি গত মাসের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংকট তৈরি হয়।

কূটনীতিতে কিছু অর্জন

অর্থনীতি, রাজনীতি ও সুশাসন নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও কূটনীতির ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়াকে সরকারের অন্যতম কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ ছাড়া ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনো জটিলতা রয়েছে। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত সফরের পরিবেশ নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।

সংস্কার ও সুশাসনে প্রশ্ন

গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়। পরে এ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়।

তবে বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর গণভোটের আদেশকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাধীন বিচার বিভাগ, গুম কমিশন, দুর্নীতি দমন, পুলিশ সংস্কারসহ কয়েকটি বিষয়ে ছয় মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে হতাশা রয়েছে।

ছয় মাসের হিসাব

বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও সাফল্য থাকলেও মানুষের প্রত্যাশার জায়গায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর কিছু উদ্যোগ এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কয়েকটি অর্জন সরকারের ইতিবাচক দিক হিসেবে সামনে এসেছে।

অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের সামনে এখনো বড় পরীক্ষা রয়েছে।

সরকারের দাবি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে এবং ছয় মাসের লক্ষ্যমাত্রার অধিকাংশই অর্জিত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরবর্তী সময়ে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চাপ কমানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করা।

সূত্র: আমার দেশ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here