ফিচার ডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দে (৪৯২ হিজরি) প্রথম ক্রুসেডের সময় জেরুজালেম ক্রুসেডারদের দখলে চলে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক বিভক্তি, আব্বাসীয় খেলাফতের দুর্বলতা এবং সেলজুক শাসকদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এই পতনের অন্যতম কারণ ছিল। অন্যদিকে, ইউরোপীয় খ্রিস্টান শক্তির ঐক্যবদ্ধ সামরিক অভিযানের ফলেই প্রথম ক্রুসেড সফল হয়।
আব্বাসীয় খেলাফতের দুর্বলতা
সে সময় আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী বাগদাদ কার্যত সেলজুকদের রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে ছিল। সুলতান মালিকশাহর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হলে সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তৎকালীন আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাজহির বিল্লাহ জেরুজালেম রক্ষার জন্য সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের কাছে একাধিকবার আবেদন জানালেও কার্যকর কোনো সামরিক সহায়তা পাননি।
প্রথম ক্রুসেডের সূচনা
১০৯৫ সালে ইতালির পিয়াচেনজা এবং পরে ফ্রান্সের ক্লারমন্টে অনুষ্ঠিত ধর্মীয় সমাবেশে পোপ আরবান দ্বিতীয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে “পবিত্র যুদ্ধ” বা ক্রুসেডের আহ্বান জানান।
তিনি ইউরোপের রাজা, সামন্ত ও নাইটদের জেরুজালেম পুনর্দখলে অংশ নিতে আহ্বান জানান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ধর্মীয় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন।
দুই ধাপে পরিচালিত হয় প্রথম ক্রুসেড
প্রথম ধাপে দরিদ্র কৃষক, সাধারণ মানুষ ও ধর্মীয় অনুসারীদের নিয়ে গঠিত বাহিনী সেলজুকদের হাতে পরাজিত হয়।
পরবর্তী ধাপে ইউরোপের অভিজাত রাজপুত্র ও নাইটদের নেতৃত্বে সুসংগঠিত বাহিনী মুসলিম ভূখণ্ডে প্রবেশ করে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নেয়।
অবশেষে ১০৯৯ সালে জেরুজালেম ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ক্রুসেডারদের চারটি রাষ্ট্র
জয়ের পর ক্রুসেডাররা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল চারটি প্রধান রাষ্ট্রে ভাগ করে শাসন শুরু করে—
- কাউন্টি অব এডেসা
- প্রিন্সিপালিটি অব অ্যান্টিওক
- কাউন্টি অব ত্রিপলি
- কিংডম অব জেরুজালেম
মুসলিমদের পরাজয়ের কারণ
ইতিহাসবিদদের মতে, মুসলিম শাসকদের পারস্পরিক অনৈক্য, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা ক্রুসেডারদের অগ্রযাত্রাকে সহজ করে দেয়।
অ্যান্টিওকসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহরের পতনের পেছনেও অভ্যন্তরীণ বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
জনগণের ক্ষোভ
জেরুজালেম ও সিরিয়া থেকে আগত শরণার্থীরা বাগদাদে এসে মুসলিম শাসকদের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়।
এক পর্যায়ে বাগদাদের সাধারণ মানুষ, আলেম, ফকিহ ও ব্যবসায়ীরা মসজিদে বিক্ষোভ করেন এবং শাসকদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন।
পুনরুত্থানের সূচনা
পরবর্তী সময়ে মুসলিম আলেম ও সামরিক নেতাদের উদ্যোগে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
১১১৩ সালে তাবারিয়া হ্রদের কাছে মুসলিম বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে। এই সময় থেকেই ইমাদউদ্দিন জেনকির উত্থান শুরু হয়।
পরবর্তীতে নুরুদ্দিন মাহমুদ এবং সর্বশেষ সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির নেতৃত্বে মুসলিমরা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হন।
১১৮৭ সালে হাট্টিনের যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন, যা ক্রুসেডের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সম্পাদকের নোট: এই লেখাটি ঐতিহাসিক ঘটনা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের বর্ণনার ভিত্তিতে প্রস্তুত। মধ্যযুগীয় ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকতে পারে।












