শাহরিয়ার বেহেস্তী
সম্পাদক ও প্রকাশক, বিডি ভিউজ বাংলা
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার
আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬, বৃহস্পতিবার
সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করার আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি অভিভাবকেরই থাকে। ভালো শিক্ষা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অনেক বাবা-মা অল্প বয়সেই সন্তানকে আবাসিক স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসায় ভর্তি করান। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মহৎ। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে আমরা কখনো কখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ভুলে যাই—সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে আমরা কি তার শৈশবটাই কেড়ে নিচ্ছি?
একটি শিশুর বেড়ে ওঠা শুধু পাঠ্যবই, পরীক্ষা আর ভালো ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন পরিবারের ভালোবাসা, বাবা-মায়ের সান্নিধ্য, ভাই-বোনের সঙ্গে সম্পর্ক, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমাজের নানা মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশে বেড়ে ওঠার সুযোগ।
পরিবারই একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। পরিবার থেকেই সে শেখে কীভাবে বড়দের সম্মান করতে হয়, ছোটদের ভালোবাসতে হয়, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয় এবং পারস্পরিক সম্পর্কের মূল্য বুঝতে হয়।
আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে ভালো শিক্ষা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে একটি শিশু পারিবারিক জীবন ও সামাজিক বাস্তবতার অনেক স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিতও হতে পারে। তাই বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুল কিংবা মাদ্রাসার বিরোধিতা নয়; বরং শিশুর সামগ্রিক বিকাশ নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার আহ্বান।
আমাদের সন্তানরা শুধু পরীক্ষায় ভালো করবে—এটাই কি আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য? নাকি আমরা চাই তারা সৎ, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল, আত্মনির্ভরশীল ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠুক?
আজ সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার নানা চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা তার একটি অংশ হতে পারে। তাই আধুনিক শিক্ষা হোক কিংবা ধর্মীয় শিক্ষা—কোনো ব্যবস্থাকেই শুধু ফলাফল দিয়ে বিচার না করে দেখতে হবে, সেটি একটি শিশুকে মানুষ হিসেবে কতটা গড়ে তুলছে।
সন্তানের জন্য সবচেয়ে দামি জিনিস সবসময় ভালো স্কুল নয়; অনেক সময় বাবা-মায়ের সময়, ভালোবাসা, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং পরিবারের উষ্ণ পরিবেশই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তাই সন্তানকে শিক্ষার সুযোগ দিন, শৃঙ্খলা শেখান, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়ে তুলুন—কিন্তু তার শৈশব, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক বিকাশের সুযোগটুকুও কেড়ে নেবেন না।
মনে রাখতে হবে—ভালো ফলাফল একজন সফল শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারে, কিন্তু ভালো পরিবার, ভালো মূল্যবোধ ও মানবিক শিক্ষা একজন ভালো মানুষ তৈরি করে।
সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের পথে তার সুন্দর শৈশব যেন হারিয়ে না যায়—সেদিকেও আমাদের নজর রাখতে হবে।










