১৩০টির বেশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নজরদারিতে জনবল সংকট; লাইসেন্সবিহীন ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযানের ঘোষণা
অনলাইন নিউজডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা
দুর্বল তদারকি, জনবল সংকট এবং জবাবদিহিতার অভাবে সাভারের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাত চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় নাগরিক সংলাপের বক্তারা। শুক্রবার অনুষ্ঠিত “বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে অব্যবস্থাপনা: বিদ্যমান সংকট ও উত্তরণের উপায়” শীর্ষক সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে।
স্থানীয় ডিজিটাল নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘হ্যালো সাভার’ এ সংলাপের আয়োজন করে।
১৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের তদারকিতে জনবল সংকট
সংলাপে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ফজলে বারী জানান, এলাকায় বর্তমানে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মিলিয়ে ১৩০টিরও বেশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এর মধ্যে ১১৭টি প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে বা সম্প্রতি নবায়ন করা হয়েছে। তবে ১৮টি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে অথবা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু বড় হাসপাতাল মানসম্মত সেবা দিলেও অনেক ছোট প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কার্যালয়ে পৃথক মনিটরিং ইউনিট ও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না।
লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান
ডা. ফজলে বারী জানান, এখন থেকে লাইসেন্সবিহীন বা লাইসেন্স নবায়ন না করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
অভিযানে যেসব বিষয় যাচাই করা হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- নিবন্ধিত চিকিৎসকের উপস্থিতি
- নার্সিং স্টাফের যোগ্যতা
- প্যাথলজি রিপোর্টের মান
- ব্যবহৃত রিএজেন্টের গুণগত মান
- পরিচ্ছন্নতা
- রোগী ভর্তি প্রক্রিয়া
- ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রস্তুতি
তিনি সতর্ক করে বলেন, নিম্নমানের সেবা, নিবন্ধিত চিকিৎসক বা নার্স না থাকা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট ব্যবহারের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করা হবে।
অনৈতিক চর্চা বাড়ছে
যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট মাহফুজুর রহমান নিপু বলেন, ২০১৮ সালের অভিযানের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
তার অভিযোগ, অনেক ক্লিনিক জরিমানা বা সিলগালা হওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে আবার চালু হচ্ছে। এছাড়া লাইসেন্স পাওয়ার আগেই শুধু আবেদন জমা দিয়ে কার্যক্রম শুরু করার ঘটনাও ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, সাভারে—
- অনিবন্ধিত ব্যক্তির মাধ্যমে অ্যানেস্থেসিয়া প্রদান,
- দক্ষ টেকনোলজিস্ট ছাড়া প্যাথলজি রিপোর্ট তৈরি,
- অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা,
- সাধারণ ওয়ার্ড থেকে অযথা আইসিইউতে রোগী স্থানান্তরের মতো অনৈতিক চর্চা বাড়ছে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, অনেক হাসপাতাল ও চিকিৎসক এখনো আন্তরিকতা ও সততার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
আইনি সংস্কার ও জনবল বাড়ানোর আহ্বান
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আব্দুস সবুর বলেন, সরকারি হাসপাতালের সীমিত সক্ষমতার কারণে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু এই খাত নিয়ন্ত্রণে সরকারের সক্ষমতা এখনো অপর্যাপ্ত।
তিনি বলেন, একজন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পক্ষে একা ১৩০টির বেশি প্রতিষ্ঠান তদারকি করা সম্ভব নয়। এ কাজের জন্য অন্তত চারজন কর্মকর্তার প্রয়োজন।
তিনি উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, প্রতিষেধক স্বাস্থ্যসেবা এবং বেসরকারি খাত তদারকির জন্য পৃথক জনবল কাঠামো গঠনের আহ্বান জানান।
পাশাপাশি ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’ যুগোপযোগী করারও দাবি জানান তিনি।
দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ
অধ্যাপক আব্দুস সবুর বলেন, সঠিক তথ্যের অভাবে অনেক রোগী হাসপাতালের দালাল চক্রের খপ্পরে পড়েন। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ওপর নির্ভর না করে, মধ্যস্বত্বভোগীদেরও একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর আওতায় আনার বিষয়ে ভাবার পরামর্শ দেন তিনি।
সংলাপে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকদের স্বেচ্ছা-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তাদের মতে, কয়েকটি নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো স্বাস্থ্যসেবা খাতের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
তারা বলেন, সাভারেই যদি মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, তবে ঢাকার ওপর রোগীর চাপ এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি—দুটিই কমে আসবে।












