Home সম্পাদকীয় মতামত ৪৮ বছরে বিএনপি—ইতিহাস, অর্জন ও ভবিষ্যতের দায়

৪৮ বছরে বিএনপি—ইতিহাস, অর্জন ও ভবিষ্যতের দায়

0
5
বিএনপির ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

ন্যাশনাল নিউজ ডেস্ক | বিডি ভিউজ বাংলা

প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আপডেট: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ১ সেপ্টেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৭৮ সালের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ দলটি ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পদার্পণ করেছে।

প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক পথচলা কোনো দলের জন্যই ছোট সময় নয়। এই দীর্ঘ সময়ে বিএনপি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো বিরোধী রাজনীতিতে, আবার কখনো কঠিন রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে পথ চলেছে। আন্দোলন, নির্বাচন, সরকার পরিচালনা, রাজনৈতিক সংঘাত, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দলটির ইতিহাস বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

বিএনপির প্রতিষ্ঠার সময় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রমরত। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত দলটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে সামনে নিয়ে আসে। বিএনপির নিজস্ব ঐতিহাসিক বর্ণনাতেও ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর দল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বড় বিজয় দলটিকে দ্রুত জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে দলটি।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিস্তার

বিএনপির রাজনৈতিক বিকাশে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি দলের নেতৃত্বে আসেন এবং দীর্ঘ সময় বিএনপিকে নেতৃত্ব দেন।

তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একাধিকবার সরকার গঠন করে। বিশেষ করে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তাঁর নেতৃত্বে সরকার পরিচালনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে আছে।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয় দলটির রাজনৈতিক শক্তির আরেকটি বড় প্রকাশ ছিল। তবে একই সঙ্গে দলটির শাসনামল, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন বিতর্ক নিয়েও দেশে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস মূল্যায়নে যেমন অর্জন স্বীকার করতে হয়, তেমনি বিতর্ক ও ব্যর্থতার দিকগুলোও নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

দীর্ঘ প্রতিকূলতার অধ্যায়

বিগত দেড় দশক বিএনপির জন্য ছিল কঠিন সময়। দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক আন্দোলন এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা সংকট দলটির সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে।

এই সময়ে দলটির নেতৃত্ব ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে আরও দৃশ্যমানভাবে কেন্দ্রীভূত হয়। ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন বলে দলটি জানিয়েছে।

রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপি সাংগঠনিকভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয় এবং বিএনপির সামনেও নতুন সম্ভাবনা ও নতুন দায়িত্বের প্রশ্ন সামনে আসে।

৪৮ বছরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—জনগণের প্রত্যাশা

একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণেরও সময়।

বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের প্রত্যাশাকে বাস্তব রাষ্ট্রনীতিতে রূপ দেওয়া। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন, মানবাধিকার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি—এসব বিষয়ে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

ক্ষমতায় থাকা এবং বিরোধী দলে থাকা—দুই অবস্থার রাজনৈতিক আচরণ এক নয়। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জনগণের কাছে জবাবদিহি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দলের জনপ্রিয়তার প্রকৃত পরীক্ষা হয় রাষ্ট্র পরিচালনার সময়।

শুধু দল নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা জরুরি

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হলো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল শক্তিশালী হবে, কিন্তু একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকেও স্বাধীন ও কার্যকর হতে হবে।

বিএনপি যদি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায়, তাহলে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য একক আধিপত্যে নয়; বরং মতের ভিন্নতা, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতিতে।

নতুন প্রজন্মের বিএনপি কেমন হবে?

৪৮ বছরে এসে বিএনপির সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নতুন প্রজন্মের কাছে দলটির রাজনৈতিক বার্তা কী?

তরুণদের কাছে শুধু অতীতের ইতিহাস যথেষ্ট নয়। তারা চায় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ, নিরাপদ সমাজ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তা।

তাই বিএনপিকে ঐতিহাসিক পরিচয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি পাঁচ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ১ সেপ্টেম্বর দলীয় কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন এবং জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের কর্মসূচি রয়েছে। এছাড়া আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ ও মাছ অবমুক্তকরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে।

শেষ কথা

৪৮ বছরের বিএনপি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ইতিহাসে যেমন আছে সাফল্য ও অর্জন, তেমনি আছে ভুল, বিতর্ক ও কঠিন সময়।

আজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত—অতীতের গৌরবকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের দায়িত্ব গ্রহণ।

বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক দলের কাছে শুধু ক্ষমতা চায় না; তারা চায় সুশাসন, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সুযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই দলটির জন্য শুধু উৎসবের দিন নয়—এটি নিজেদের অর্জন মূল্যায়ন, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের নতুন অঙ্গীকার করার দিন।

৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলার পর বিএনপির সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—ইতিহাসের দল থেকে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের দল হিসেবে তারা নিজেদের কতটা প্রমাণ করতে পারে।

বিডি ভিউজ বাংলা মনে করে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ শক্তিশালী করতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ, সুশাসন ও উন্নত রাষ্ট্র নির্মাণের সক্ষমতায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here